কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI) এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ChatGPT থেকে শুরু করে ছবি তৈরি, ভিডিও তৈরি, অনুবাদ, তথ্য বিশ্লেষণ—প্রতিদিন কোটি কোটি AI-ভিত্তিক কাজ সম্পন্ন হচ্ছে।
কিন্তু আপনি কি জানেন, AI-এর এই বিশাল প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের পেছনে পানিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়?
অনেকের কাছে বিষয়টি অবাক করার মতো হলেও, এর পেছনে রয়েছে খুবই বাস্তব একটি কারণ—AI চালানোর সার্ভারগুলোকে ঠান্ডা রাখা।
![]() |
| “AI নিজে পানি পান করে না—তবে AI চালানো ডেটা সেন্টারের সার্ভার ঠান্ডা রাখতে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে পরোক্ষভাবে পানি ব্যবহৃত হতে পারে।” |
💧 AI-এর জন্য পানি লাগে কেন?
AI নিজে সরাসরি পানি ব্যবহার করে না। AI মডেলগুলো পরিচালিত হয় বিশাল বিশাল ডেটা সেন্টারে থাকা হাজার হাজার সার্ভার ও GPU-এর মাধ্যমে।
এই সার্ভারগুলো যখন প্রচুর পরিমাণে হিসাব-নিকাশ করে, তখন অনেক তাপ উৎপন্ন হয়। সার্ভার অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
তাই ডেটা সেন্টারগুলোতে বিভিন্ন ধরনের Cooling System ব্যবহার করা হয়।
কিছু সিস্টেমে পানি ব্যবহার করে তাপ সরিয়ে নেওয়া হয়। আবার কিছু ডেটা সেন্টারে পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ঠান্ডা করার ব্যবস্থা থাকে। ফলে AI-এর কম্পিউটিং যত বাড়ে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পানির ব্যবহারও বাড়তে পারে।
🖥️ শুধু সার্ভার ঠান্ডা করতেই কি পানি লাগে?
না। বিষয়টি আরও একটু বড়।
ডেটা সেন্টারের পানির ব্যবহারকে মোটামুটি দুইভাবে দেখা যায়—
১. সরাসরি পানি ব্যবহার:
ডেটা সেন্টারের Cooling System-এ পানি ব্যবহার করা হয়।
২. পরোক্ষ পানি ব্যবহার:
ডেটা সেন্টার চালাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন। সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও কিছু ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি ব্যবহৃত হয়। ফলে AI-এর পানির footprint হিসাব করার সময় সরাসরি ও পরোক্ষ—দুই ধরনের ব্যবহারই বিবেচনা করা হতে পারে।
📊 AI-এর পানি ব্যবহারের পরিমাণ কত?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—প্রতিটি AI প্রশ্নের জন্য নির্দিষ্ট একই পরিমাণ পানি লাগে না।
পানি ব্যবহারের পরিমাণ নির্ভর করতে পারে—
- কোন ডেটা সেন্টারে কাজটি হচ্ছে
- সার্ভারের দক্ষতা
- Cooling System-এর ধরন
- সেই এলাকার আবহাওয়া
- বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসছে
- AI মডেলের আকার ও কাজের ধরন
তাই ইন্টারনেটে দেখা “একটি প্রশ্নে ঠিক X মিলিলিটার পানি লাগে”—এ ধরনের সংখ্যাকে সব AI সিস্টেমের জন্য একই সত্য হিসেবে ধরা ঠিক নয়।
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রে AI সার্ভারগুলোর ২০২৪–২০৩০ সময়কালের সম্ভাব্য বার্ষিক পানি footprint ৭৩১ থেকে ১,১২৫ মিলিয়ন ঘনমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে মডেল করা হয়েছে। গবেষণাটিতে অবশ্য এই হিসাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তাও রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
🌍 তাহলে কি AI পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর?
বিষয়টি এতটা সরল নয়।
AI আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সহজ করছে। চিকিৎসা গবেষণা, শিক্ষা, ব্যবসা, বিজ্ঞান, সফটওয়্যার উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে AI-এর ব্যবহার বাড়ছে।
তবে একই সময়ে AI-এর দ্রুত বিস্তারের কারণে বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের AI প্রযুক্তিকে আরও পরিবেশবান্ধব করার জন্য দক্ষ Cooling System, কম পানি ব্যবহারকারী প্রযুক্তি এবং পরিষ্কার বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে, ২০২৫ সালের একটি Nature গবেষণায় উন্নত cooling technology যেমন cold-plate ও immersion cooling ব্যবহারে ডেটা সেন্টারের পানি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য হ্রাসের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
🔬 ভবিষ্যতে কি AI কম পানি ব্যবহার করতে পারবে?
হ্যাঁ, প্রযুক্তি সেই দিকেই এগোচ্ছে।
নতুন প্রজন্মের ডেটা সেন্টারে আরও দক্ষ cooling technology, উন্নত server design এবং শক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের লক্ষ্য শুধু “আরও শক্তিশালী AI” তৈরি করা নয়—বরং এমন AI তৈরি করা, যা একই কাজ কম বিদ্যুৎ ও কম পানিতে করতে পারে।
💡 শেষ কথা
AI আমাদের ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। কিন্তু এর পেছনে থাকা বিশাল ডেটা সেন্টার অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাবও আমাদের বোঝা প্রয়োজন।
তাই AI ব্যবহার বন্ধ করার প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—
কীভাবে আরও দক্ষ, কম পানি-নির্ভর এবং পরিবেশবান্ধব AI প্রযুক্তি তৈরি করা যায়?
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে যদি পরিবেশের সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে AI এবং পরিবেশ—দুটোকেই একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
